সাদা ভাত, সব রোগের একমাত্র কারণ

ভাত মানেই সাদা ভাত যা কিনা বাঙালির প্রাণে খাবার, প্রধান খাবার। ভাত ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না। অথচ আধুনিক সময়ে সকল রোগের শুধু একটিই কারণ আর তা হলো সাদা ভাত।

অতীতের দিনগুলো ছিলো সুখের। কম রোগ-শোক, গায়ে প্রচুর শক্তি আর মনে অনেক আনন্দ। সময়ের ব্যবধানে খাদ্যে ভেজাল বেড়েছে। আমাদের শরীরে বেড়েছে চর্বি, কমেছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।

ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু সাদা ভাত খেয়ে আমাদের আজ কী দুর্দশা তার কোন খোঁজ রাখি না। আমরা শুধু খোঁজ রাখি কোন চালটা চিকন, কোনটির ভাতের স্বাদ কেমন। কিন্তু এই সাদা ভাত আমাদের কী কাজে লাগছে তা কি জানি? আমরা জাতি শুধু ক্ষুধা মিটেছে কিনা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলস্টেরলসহ আরও নানা রোগ বালাই আগের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। খাদ্যে ভেজাল বাড়ার সাথে সাথেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসব রোগ বালাই। চলুন আজকে জেনে নিই ভাত খাওয়ার কি ফল।

সাদা ভাত খেলে কি কি ক্ষতি হয়?

ভাত বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রধান খাদ্য। সাদা ভাতের অপকারিতার শেষ নেই। এটি সু-স্বাদুও, তবে সাদা ভাত খেলে যেসব ক্ষতি হতে পারে তা হলো:

  • কার্বোহাইড্রেটে বৃদ্ধি: ভাতে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট থাকে। এই উচ্চমাত্রার কার্বোহাইড্রেট শরীরে গ্রহণ করার ফলে রক্ত শর্করার (ব্লাড সুগার) বেড়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের ডায়াবেটিস হতে পারে। এছাড়াও ডায়াবেটিস আক্রান্তদের জন্য ভাত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সাদা ভাতের অপকারিতার মধ্যে এই ক্ষতিটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য।
  • অতিরিক্ত ক্যালোরি: আমরা তিন বেলা ভাত খেয়ে থাকি। ভাতের সাথে সাধারণত সবজি, মাছ ডাল ইত্যাদি খেয়ে থাকি। তবে ভাতের সাথে যা-ই খাই না কেন যদি তাতে ‍সুষম পুষ্টি না থাকে তবে ভাত খাওয়ার ফলে শরীরে ওজন বাড়বে।
  • পুষ্টির অভাব: ধান থেকে চাল উৎপাদনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চালের গুণাগুণ নষ্ট হয়। সাধারণ ও অটোমেটিক রাইসমিলে উৎপাদিত চালে থাকে না ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ। তাই সাদা ভাতে পুষ্টির খুবই অভাব।
  • হৃদরোগের ঝুঁকি: সাদা ভাতে অধিক মাত্রায় চর্বি থাকে। এছাড়াও এই প্রধান খাবারের সাথে লবণযুক্ত অনেক খাবার আমরা খেয়ে থাকি যা আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ভাত খাওয়ার অপকারিতার ফলেই দিন দিন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়ছে।
  • গ্লুটেন সংবেদনশীলতা: ভাত একটি গ্লুটেনমুক্ত খাদ্য। তবুও কোন কোন ক্ষেত্রে ভাত হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
  • অতিরিক্ত সোডিয়াম: ভাত রান্নার সময় যদি লবণ ব্যবহার করা হয় তবে তা হতে পারে উচ্চ রক্তচাপের কারণ।

সুতরাং, ভাত খাওয়ার সময় পরিমাণ এবং সুষম খাদ্যের দিকে নজর দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্য গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ভাত শরীরের জন্য কতটা উপকারী?

ভাত শরীরের জন্য বেশ উপকারী একটি খাদ্য। এটি প্রধানত কার্বোহাইড্রেটের উৎস, যা আমাদের শরীরের জন্য শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। ভাতে থাকা কিছু উপকারী উপাদান এবং তাদের সুবিধা নিম্নরূপ:

শক্তির উৎস: ভাত দ্রুত শক্তি প্রদান করে, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে সহায়ক।

পুষ্টি উপাদান: ভাতে কিছু পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান থাকে, বিশেষ করে ব্রাউন রাইসে।

পাচনশক্তি: ভাত সহজে হজম হয় এবং এটি পাচনতন্ত্রের জন্য উপকারী।

সন্তুষ্টি: ভাত খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে পেট ভরা থাকে, যা অতিরিক্ত খাওয়া থেকে রক্ষা করে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: ভাত অনেক দেশের খাদ্য সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সামাজিক মিলনমেলায় এবং পারিবারিক খাবারে ব্যবহৃত হয়।

তবে, ভাতের সাথে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার যেমন সবজি, মাংস বা ডাল খাওয়া উচিত, যাতে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা যায়। অতিরিক্ত ভাত খাওয়া বা শুধুমাত্র ভাতের উপর নির্ভরশীল থাকা স্বাস্থ্যকর নয়।

সাদা ভাত খেলে কোন রোগের জন্য ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে?

নিয়মিত সাদা ভাত খেলে কয়েক ধরণের রোগীরা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন। তবে খুব বেশি পরিমাণ ভাত খেলে কিংবা ভাত যদি প্রতিদিনের সুষম খাবারের অংশ না হয় তবে সেক্ষেত্রে সাদা ভাত নিম্নোক্ত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য হুমকিস্বরূপ।

ডায়াবেটিস: ভাত একটি শর্করা জাতীয় খাবার। এতে উচ্চ মাত্রায় কার্বোহাইড্রেট থাকে যা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রক্তে সুগার বেড়ে যাবে, চর্বি এবং কোলস্টেরলও বেড়ে যাবে।

ওজন বৃদ্ধি: ভাত খেলে শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং স্থূলতাও বাড়তে থাকে একই হারে।একইসাথে ওজন বৃদ্ধিজনিত কারণে যেসব রোগ দ্রুত বাড়ে সেগুলোও শরীরে বিস্তার লাভ করে।

পাচনতন্ত্রের সমস্যা: সাদা ভাতে ফাইবার থাকে না বললেই চলে। ফাইবার না থাকা কিংবা কম থাকার কারণে তা হজমে সমস্যা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয় সাদা ভাত খাওয়ার জন্য।

গ্লুটেন সংবেদনশীলতা: যদিও ভাত গ্লুটেন-মুক্ত, তবে কিছু মানুষের জন্য এটি হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

মেটাবলিক সিন্ড্রোম: অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ মেটাবলিক সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে সম্পর্কিত।

সুতরাং, ভাত খাওয়ার সময় পরিমাণ এবং সুষম খাদ্যের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

প্রতিদিন কতটুকু ভাত খাওয়া উচিত?

একজন মানুষ প্রতিদিন কতটুকু ভাত খাবে এটি সম্পূর্ণই নির্ভর করে তার শারীরিক গঠন, দীর্ঘ দিনের অভ্যাস, স্বাস্থ্যের ধরণের উপর। সাধারণত নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি খেয়ে থাকেন।

আবার যারা বেশি পরিশ্রম করেন তারা যারা কম পরিশ্রম করেন তাদের চেয়ে বেশি খেতে পারার কথা। সাধারণত একজন প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ মানুষ ১০০ গ্রাম চালের ভাত খেতে পারে। এই পরিমাণ ভাতে প্রায় ৩৫০-৩৬০ কিলোক্যালরি থাকে।

তবে যারা কায়িক পরিশ্রমও করেন না তাদের জন্য ৬০-৭০ গ্রাম চালের ভাতই যথেষ্ট। আবার যাদের ওজন কমানোর প্রয়োজন অথবা ডায়াবেটিসের সমস্যা আছে তারা আরও কম পরিমাণ ভাত খেতে পারেন। তবে ডায়াবেটিস আক্রান্তরা ভাত না খেলেই সবচেয়ে ভালো।

রাতে ভাত খেলে কি হয়?

রাতে ভাত খেলে কিছুই হয় না। তবে অনেক কিছু হতেও পারে। ঘাবড়ে যাচ্ছেন? কোন ব্যাপার না। যাদের হজমশক্তি অনেক বেশি, যারা অনেক পরিশ্রম করেন তারা রাতে ভাত খেতেই পারেন। তবে যারা সাধারণত কম পরিশ্রম করে থাকেন তাদের রাতের বেলায় ভাত না খাওয়াই ভালো।

আমরা সাধারণত রাতে খাওয়ার পর কোন কাজ করি না, সোজা ঘুমাতে যাই অথবা কিছুক্ষণ বসে থাকি। সে কারণে রাতে খাওয়া ভাত সহজে হজম হয় না ফলে গ্যাস বা এসিডিটি সৃষ্টি করে।

অপরদিকে রাতে ভাত খাওয়ার ফলে আমরা যে ক্যালরি গ্রহণ করি তা ব্যয় হয় না ফলে রক্তে সুগারের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তে থাকে। সুগার বাড়তে বাড়তে একসময় টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা দিলে আমরা বুঝতে পারি আমরা ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়েছি। এর পেছনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কারণ হলো রাতে ভাত খাওয়া।

১০০ গ্রাম ভাতের পুষ্টি উপাদান

১০০ গ্রাম ভাতে কি কি আছে জানেন? যা-ই থাকুক সবচেয়ে বেশি আছে কার্বোহাইড্রেট যা আমাদের শরীরের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তবে কিছু পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট আমাদের প্রয়োজনও হয়। আমরা যে হারে ভাত খেয়ে থাকি সে হিসেবে ভাত থেকে গ্রহণ করা কার্বোহাইড্রেট আমাদের শরীরের জন্য ভয়ংকর। ১০০ গ্রাম ভাতে কি কি উপাদান কি পরিমাণ আছে চলুন তা জেনে নিই নিচের ছক থেকে।

খাদ্য উপাদানপরিমাণ
ক্যালোরি১৩০ কিলোক্যালোরি
শর্করা২৮ গ্রাম
প্রোটিন২.৭ গ্রাম
ফ্যাট (চর্বি)০.৩ গ্রাম
ফাইবার (আঁশ)০.৪ গ্রাম
ভিটামিন বি১ (থায়ামিন)সামান্য পরিমাণ
ভিটামিন বি৩ (নিয়াসিন)সামান্য পরিমাণ
ম্যাঙ্গানিজসামান্য পরিমাণ
ম্যাগনেসিয়ামসামান্য পরিমাণ
ফসফরাসসামান্য পরিমাণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *